কুরবানী

নিচের ৫টি প্রশ্ন প্রায়ই শুনা যাই  তাই আজ এ সম্পর্কে বিস্তারিত একটা পোস্ট দিলামঃ

সবাই কে ঈদের সুভেচ্ছা………। ঈদ মুবারক ।

:কুরবানির নিয়মাবলী সর্ম্পকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা:

১. কুরবানী কিভাবে দিতে হয়?
২. শরিকানা কুরবানীর নিয়মাবলী গুলো কি কি?
৩. কুরবানীর গোশত্ কতদিন খাওয়া যাবে?
৪. কুরবানীর গোশত্ কি না বিলিয়ে একা একাই খাওয়া যাবে?
৫. কুরবানীর সমপরিমান টাকা কি গরিবদের বিলিয়ে দিলে কুরবানী হবে কি?

১. কুরবানী কিভাবে দিতে হয়?
—————————–
সামর্থ থাকলে কুরবানী দেওয়া জরুরি। আবু হুরাইরা রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাঃ বলেন, যে ব্যক্তি সামর্থ থাকা সত্বেও কুরবানী করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তি না হয়।
من كان له سعة و لم يضح فلا يقربن مصلانا ইবনে মাজাহ ৯/২৭৬, হাদিস ৩১১৪।
কুরবানী ঈদের নামাজের পূর্বে করা যাবে না। বারা ইবনে আজিব রাঃ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, আমি রাসুলুল্লাহ সাঃ কে খুতবা প্রদান করতে শুনেছি, কুরবানীর ঈদে আমরা প্রথমে নামাজ আদাই করব, তার পর ফিরে গিয়ে কুরবানী আদাই করব। যে ব্যক্তি এই পদ্ধতী অনুস্বরণ করল সে আমার সুন্নত কে অনুস্বরণ করল। আর যে নামাজের পুর্বেই কুরবানীর পশু জবেহ করল এটা তার জন্য সাধারণ গোশতই হলো কুরবানী নয়। (হাদিস সহিহ)
إِنَ�‘ أَوَ�‘لَ مَا نَب�’دَأُ مِن�’ يَو�’مِنَا هَذَا أَن�’ نُصَلِ�‘يَ ثُمَ�‘ نَر�’جِعَ فَنَن�’حَرَ فَمَن�’ فَعَلَ فَقَد�’ أَصَابَ سُنَ�‘تَنَا
বোখারী ২/৩৬৫, হাদিস ৯৫১।

কুরবানীর পশু মোট আট প্রকার। যথা ভেড়া বা দুম্বা, ছাগল, গরু, উট। এই প্রত্যেকটার নর ও মাদি এই হিসাবে আট প্রকার। সুরাতুল আনআম ১৪৪-১৪৫। গরুর ন্যয় মহিষের উপর ও যাকাত ফরজ হয় বিধায় কেউ কেউ মহিষ দ্বারা কুরবানী করা ও জায়েজ বলেছেন।

চার প্রকারের পশু দ্বারা কুরবানী করা বৈধ নয়। বারা ইবনে আযেব রাঃ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাঃ আমাদের মাঝে দাঁড়ালেন তারপর বললেন,
أَر�’بَعٌ لَا تَجُوزُ فِي الضَ�‘حَايَا : ال�’عَو�’رَاءُ ال�’بَيِ�‘نُ عَوَرُهَا ، وَال�’مَرِيضَةُ ال�’بَيِ�‘نُ مَرَضُهَا وَال�’عَر�’جَاءُ ال�’بَيِ�‘نُ ضَل�’عُهَا ، وَال�’كَبِيرَةُ الَ�‘تِي لَا تُن�’قِي
চার ধরনের পশু, যা দিয়ে কোরবানি জায়েজ হবে না। অন্য বর্ণনায় বলা হয়েছে পরিপূর্ণ হবে না, অন্ধ; যার অন্ধত্ব স্পষ্ট, রোগাক্রান্ত; যার রোগ স্পষ্ট, পঙ্গু ; যার পঙ্গুত্ব স্পষ্ট এবং আহত; যার কোন অংগ ভেংগে গেছে।
মুসনাদু আহমদ ৩৮/১০৬, হাদিস ১৭৯১৯,

কুরবানীর পশু সুন্দর, সুঠাম ও নিখুঁত হওয়া চাই। কানা, খোঁড়া, রোগা, জীর্ণশীর্ণ, অর্ধেক কান কাঁটা বা ছিদ্র করা, অর্ধেক শিং ভাঙ্গা, অর্ধেক লেজ কাঁটা পশু দ্বারা কুরবানী করা উচিৎ নয়। তবে ক্রয় করার পর এই সব দোষ দেখা দেলে তাতে কোন সমষ্যা নাই।
মিরআৎ ২/৩৬৩।

কুরবানীর পশু জবেহ করার আদব
যে বস্তু দিয়ে পশুকে জবেহ করা হবে তা ধারালো হওয়া উচিৎ, যাতে করে পশুর দীর্ঘক্ষণ ধরে কষ্ট না হয়। শাদ্দাদ ইবনে আওস রাঃ বলেন, রাসুলুল্লাহ সাঃ বলেছেন আল্লাহ তায়ালা প্রতিটি ব্যপারে এহসান করতে বলেছেন, সুতরাং যখন তোমরা কোন পশুকে জবেহ করবে তখন তাকে উত্তম ভাবে জবেহ কর (অর্থাৎ ছুরিকে ভালকরে ধারাল করে নাও)
ان الله قد كتب الاحسان في كل شيئ واذا ذبحتم فأحسنوا الذبحة وليحد أحدكم شفرتة আদ দারসুল ইয়াওমিইয়াহ পৃষ্ঠা নাম্বার ৫৮৯।

কুরবানীর পশু জবেহ করার সময় দোআ পাঠ করা।
জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রাঃ থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাঃ একটি সুন্দর শিং ওয়ালা সাদা কালো দুম্বা কুরবানী করলেন আর তখন তিনি এই দোআটি পাঠ করলেন
إني وجهت وجهي للذي فطر السماوات والأرض حنيفاً و ما أنا من المشركين ، إن صلاتي ونسكي و محياي و مماتي لله رب العالمين ، لا شريك له و بذلك أمرت و أنا أول المسلمين ، اللهم منك و لك
তার পর বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার” বলে জবেহ সম্পন্ন করবে।
জবেহ করা সম্পন্ন হলে বলবে
اللهم تقبل مني كما تقبلت من حبيبك محمد وخليلك إبراهيم عليهما الصلواة والسلام

যে বা যিনি কুরবানীর পশু জবেহ করে থাকেন তিনি সাধারণত এই দুআটি পড়তে জানারই কথা। তারপরও সর্ব সাধারণের সুবিধার্থে উচ্চারণ লিখে দেওয়া হল।
===============================
কুরবানী করার সময়কার দুআ।
ইন্নি ওয়াজ জাহতু ওয়াজ হিয়া লিল্লাযি ফাতারাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্বা হানিফাও ওয়ামা আনা মিনাল মুশরিকিন। ইন্না সালাতি ওয়া নুসুকি ওয়া মাহইয়ায়া ওয়ামা মামাতি লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন। লা শারিকা লাহু ওয়াবি যালিকা উমিরতু ওয়া আনা আওয়ালুল মুসলিমীন। আল্লাহুম্মা মিনকা ওয়া লাক……….।
তার পর বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার” বলে জবেহ সম্পন্ন করবে।
জবেহ করা সম্পন্ন হলে বলবে
আল্লাহুম্মা তাকাব্বাল মিন্নি কামা তাকাব্বালতা মিন হাবিবীকা মুহাম্মাদিও ওয়া খালিলিকা ইব্রাহীমা আলাইহিমা আস্সালাতু ওয়াস সালাম।
================================

২. শরিকানা কুরবানীর নিয়মাবলী গুলো কি কি?

গোশত বেশি পাবার আশায় বড় গরু বা মহিষের সাথে কয়েক জনে মিলে শরিকে কুরবানী দেওয়ার চেয়ে একটা ছাগল বা দুম্বা ভেড়া কুরবানী দেওয়াই উত্তম। কেননা রাসুলুল্লাহ সাঃ মদিনার বাড়ীতে থাকা অবস্থায় শরিকে কুরবানী দিয়েছেন বলে যানা যায় না। তবে তিনি সফরে একটি গরুতে সাত শরিক হয়ে কুরবানী করেছেন বলে প্রমাণিত আছে। فأمرنا رسول الله صلى الله عليه و سلم أن نشترك في الإبل و البقر، كل سبعة منا في
জাবের রাঃ বলেন আমরা রাসুলুল্লাহ সাঃ এর সাথে সফরে ছিলাম। যখন কুরবানীর সময় এল, তখন রাসুলুল্লাহ সাঃ আমাদের কে আদেশ করলেন যেন আমরা গরু ও উটে শরিকে কুরবানী করি। আমরা একটি গরু ও উটে সাত জন করে শরিক হয়েছিলাম।
সহিহ মুসিলম ৬/৪৭৪, হাদিস ২৩২৩, মুসনাদু আহমদ ২৮/১৫১, হাদিস ১৩৬০২।

ছাগল বা দুম্বা দ্বারা কুরবানী করাই উত্তম এর কারণ সমুহ-
১।
ইব্রাহিম আঃ যখন তার পুত্র ইসমাঈল আঃ কে কুরবানী করতে নিলেন তখন আল্লাহ তায়ালা ইসমাঈল আঃ এর পরিবর্তে জান্নাত থেকে যে পশু প্রেরণ করেছিলেন তা ছিল দুম্বা।

২।
মানুষের ব্যবহারিক জীবনে উট গরুর তুলনায় দুম্বা বা ছাগলের প্রয়োজন অনেক কম।

৩।
অধিকাংশ মানুষের ক্রয় সিমার মধ্যে।

৪।
সব চেয়ে বড় কথা হল, রাসুলুল্লাহ সাঃ মদিনায় থাকাবস্থায় উট গরু ইত্যাদি পাওয়া যাওয়া সত্বেও সর্বদাই তিনি দুম্বা কুরবানী দিয়েছেন। তবে জমহুর ওলামাগণ বলেন রক্ত প্রবাহিত হওয়ার দিক থেকে সর্বোত্তম হলো উট, তার পর গরু,তার পর ভেড়া বা দুম্বা,তার পর ছাগল। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা বলেন لن ينال الله لحومها ولا دمائها ولكن يناله التقوي منكم আমার কাছে তার রক্ত ও মাংস পৌছে না, বরং আমার কাছে তার তাক্ওয়া-ই পৌছে থাকে।
আল কুরআন সুরাতুল হজ্জ।

৩. কুরবানীর গোশত্ কতদিন খাওয়া যাবে?

কোরবানির গোশত যতদিন ইচ্ছা ততদিন সংরক্ষণ করে খাওয়া যাবে। ‘কোরবানির গোশত তিন দিনের বেশি সংরক্ষণ করা যাবে না বলে মুসলিম শরিফে আলি রাঃ থেকে যে হাদিস খানা বর্ণিত হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে যে রাসুলুল্লাহ সাঃ তোমাদের কে কুরবানীর গোশত তিন দিনের বেশি সময় ধরে ভক্ষণ করতে নিষেধ করেছেন এই হাদিস এর হুকুম রহিত হয়ে গেছে। কেননা অপর হাদিসে সালমা ইবনে আকওয়া রাঃ থেকে একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে যে, كُلُوا وَأَط�’عِمُوا وَادَ�‘خِرُوا তোমরা নিজেরা খাও ও অন্যকে আহার করাও এবং সংরক্ষণ কর। তাই যতদিন ইচ্ছা ততদিন সংরক্ষণ করে রাখা যায়।
বোখারী ১/২৭৩, হাদিস ৫১৪৩, মুসনাদু আহমদ ২৩/১৬৩, হাদিস ১১১১৪, মিশকাতুল মাছাবিহ ২/৯৫, হাদিস ২৭৪৪।

৪. কুরবানীর গোশত্ কি না বিলিয়ে একা একাই খাওয়া যাবে?

আসলে কুরবানীর গোশত কতটুকু নিজেরা খাবে, কতটুকু দান করবে আর কতটুকু উপহার হিসেবে আত্বিয় স্বজনদের কে প্রদান করবে এর পরিমাণ সম্পর্কে কোরআনে বা হাদিসে কিছু নির্ধারণ করে নি। তবে উলামায়ে কেরাম বলেছেন, কোরবানির গোশত তিন ভাগ করে একভাগ নিজেরা খাবে, এক ভাগ দরিদ্রদের মাঝে দান করবে ও এক ভাগ উপহার হিসেবে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও প্রতিবেশীদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়া উত্তম। কেউ কেউ আছেন যারা গরীব মিসকিন ও আত্বিয় স্বজনদের কে দেওয়ার চেয়ে নিজেদের ভাগটাকে বড় রাখাকেই বেশি পছন্দ করেন। আর এটা কুরবানীর উদ্দিশ্যের বহির্ভুত। কখনো কখনো বাচ্চারা বলে যে, আমাদের জন্য বেশি করে গোশত রাখ। তখন বড়দের উচিৎ হবে তাদের কে এই কথা শিক্ষা দেওয়া যে, কুরবানীর উদ্দিশ্য বেশি করে গোশত খাওয়া নয়, বরং পাড়া প্রতিবেশি আত্বিয় স্বজন ও গরীব দুখিদের কে নিয়ে সবাই মিলে ঈদের নির্মল আনন্দ উপভোগ করাই হল কুরবানীর উদ্দিশ্য।

৫. কুরবানীর সমপরিমান টাকা কি গরিবদের বিলিয়ে দিলে কুরবানী হবে কি?

না, তাতে কুরবানী আদায় হবে না।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s